1. admin@bd-journalist.com : বিডি জার্নালিস্ট : বিডি জার্নালিস্ট
  2. miraj20@gmail.com : নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজস্ব প্রতিবেদক
  3. commercial.rased@gmail.com : Staff Reporter : Staff Reporter
  4. newuser@mail.com : Staff Reporter : Staff Reporter
বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ০২:৪৫ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :

জলবায়ু পরিবর্তন জনিত দুর্যোগের ঝুঁকতে বাংলাদেশঃ বাড়ছে আশ্রয়হীন উদ্বাস্তু সংখ্যা

বিডি জার্নালিস্ট ডেস্ক :
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২০

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়টি উঠে এসেছে প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমে, খবর হয়ে উঠে এসেছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদভিত্তিক চ্যানেলে। জলবায়ু পরিবর্তনের নানা ঘাত- প্রতিঘাতে পরিবেশের বিরূপ অবস্থায় রূপ নিচ্ছে তাই নয়, এক দিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রকার দুর্যোগে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষ সহায়সম্বল হারাচ্ছে ঠিক
তেমনি ভূমণ্ডলীয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রভাবিত হবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা।

 

বর্ধিত হারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় এলাকায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বিপুল সংখ্যক জনমানব। এসকল আশ্রয়হীন উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নিচ্ছে নিকটবর্তি বড় শহরগুলোতে, কিংবা রাজধানী শহরে। ফলে বাড়ছে সেসব শহরের জনসংখ্যা। সেসব শহরগুলো হিমশিম খাচ্ছে বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সামলাতে। এছাড়া এসকল উদ্বাস্তুরা ঢাকা শহরে এসে হচ্ছেন বস্তির বাসিন্দা। ইউনিসেফ এর মতে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও খরার মতো বিরূপ আবহাওয়াজনিত ঘটনার সম্মিলন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও নোনাপানির অনুপ্রবেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি ঘটনাসমূহ পরিবারগুলোকে আরও বেশি দারিদ্র্য ও স্থানচ্যুতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

 

জার্মানির রুহর বিশ্ববিদ্যালয় বোখাম এবং ডেভেলপমেন্ট হেল্প অ্যালায়েন্স নামে একটি জার্মান বেসরকারি মানবিক সংস্থা ২০১৮ সালে যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করে। জরিপে দাবি করা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকির মধ্যে থাকা শীর্ষ ১৫টি দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের নামও। ওয়াল্ড রিক্স রিপোট ২০১৮ অনুযায়ী
বাংলাদেশ অবস্থান নবম স্থানে। যেখানে ঝুকির মাত্রা ছিল ১০০ এর মধ্যে ১৭.৩৮। আর ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে
নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি সবগুলো দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং হচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক অনেক বেশি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রভাব গুলো হল বৃষ্টিপাত হ্রাস, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, মরুকরণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, সুপেয় পানির অভাব।


জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তন্মধ্যে ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধ্বসের মাত্রাবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। এছারাও স্থায়ী জলাবদ্ধতা, শিলাবৃষ্টি, কিছু সময়ের জন্য অতিবৃষ্টি ও তীব্র বন্যা, ভূমিকম্প যেমন বেড়েছে ঠিক তমনি ভাবে সুনামির সম্ভাবনা রয়েছে। অতিখরা, অতিবৃষ্টি, প্রলয়ঙ্করী ঝড়, তীব্র শীত, অসহনীয় তাপপ্রবাহ, করাল বন্যা ও ভূমিধস আমাদের জানিয়ে দেয় জলবায়ু পরিবর্তন এক কঠিন বাস্তবতা, যা অস্বীকার করে জীবন অতিবাহিত করা কোন ভাবেই আর সম্ভব নয়।

‘বিশ্ব জলবায়ু ঝুঁকি সূচক-২০২০’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১৯১টি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বড় দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। ২০১০ সাল থেকে জার্মানওয়াচ বিশ্বের সব কটি দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও ঝুঁকি নিয়ে ওই সূচকভিত্তিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্থিক
ক্ষতি, জীবনের ক্ষতি ও দুর্যোগের আঘাতের মোট সংখ্যাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশের তালিকায় এক নম্বরে ছিল। যে বছর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়, তার আগের ২০ বছরে ওই দেশটিতে জলবায়ু
পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের আঘাত ও প্রভাব আমলে নেওয়া হয়।

 

প্রথম তিন বছর বাংলাদেশের নাম শীর্ষে থাকার অন্যতম কারণ ছিল ১৯৯১ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯৫ ও ১৯৯৮ সালের বন্যা, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা। ২০০৭ সালে ১৫ নভেম্বর যে ঘূর্ণিঝড় হয় তার নাম সিডর। ২২৩ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা সিডরের তাণ্ডবে খুলনা-বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় ১৫-২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হয়। সিডরে রেডক্রসের হিসেবে ১০ হাজার মানুষ মারা গেছে বলা হলেও সরকারিভাবে ছয় হাজার বলা হয়। পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হলো ‘আইলা’।

এটি ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানে। যার বাতাসের গতিবেগ ছিল ৭০-৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এতে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাংশে উপকূলে প্রায় তিন লাখ মানুষ গৃহহীন হয়৷ পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা যায়, ২০০৪-২০০৮ -এই চার বছর ভাঙনের মাত্রা বেড়েছে, আর ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে তা সর্বোচ্চ হয়েছে। ২০০৯ সালে ভাঙন কবলিত ছিলো ভোলার সীতারাম এবং উত্তর রামদাসপুর। মনপুরা উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে বিগত ১৫ বছরের তুলনায় ২০০৯ সালের ভাঙনের হার বেশি। ২০০৯সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনগুলির একটিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী পদ্মা ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন অব্যাহত আছে।

 

এবং আরও প্রায় ৫০০ কিলোমিটার জুড়ে নতুন করে ভাঙন দেখা দিতে পারে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রেক্ষাপটে হাতিয়ার উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর- পশ্চিমাংশের তমরদ্দি, চরকিং ও চরঈশ্বর ইউনিয়ন এবং সুখচর ও নলচিরার অবশিষ্টাংশ ব্যাপক ভাঙনের কবলে রয়েছে।
নিঝুম দ্বীপে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা বন ধ্বংসের পথে। নদীভাঙন ছাড়াও ঘূর্নিঝড় আইলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এই কৃত্রিম উপকূলীয় বনটি। দিনে দিনে বনটি ছোট হয়ে আসছে। এই বন বিলুপ্ত হলে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বনগোপসাগরের আগ্রাসনে টিকতে পারবে না দ্বীপের ২২,০০০-এরও বেশি মানুষ।

 

ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ ২০১৩ সালের ১৬ মে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানে৷ এটির বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার৷ এই ঝড় বাংলাদেশে ১৭ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়৷ ২০১৩ সালে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় মৌসুমী বন্যা দেখা দেয়। এতে কয়েক লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। ব্যাপক ক্ষতি হয় গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের। অনেকের ফসলিজমি
ও বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। প্রধান তিন নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা ছাড়াও নদী বিধৌত বাংলাদেশের ছোট বড় নদ-নদীর
সংখ্যা প্রায় ৩০০টি। এসব নদ-নদীর তটরেখা যার দৈর্ঘ্য হচ্ছে প্রায় ২৪ হাজার ১৪ কিলোমিটার।

 

এরমধ্যে কমপক্ষে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার তটরেখা নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। তাই এ দেশের নদী ভাঙন একটি অতি প্রাচীন ও ভয়াবহ সমস্যা। বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রতিবেদন ২০১৪ তথ্যসূত্র মতে, প্রতিবছর নদী ভাঙন এলাকা থেকে ২০-৩০
শতাংশ বাস্তুহারা জনগোষ্ঠী নিকটবর্তী শহরে এবং বড় শহরে অভিগমন করে থাকে। ঢাকা শহরের বিপুল সংখ্যক বস্তিবাসীর প্রায় ২৫ শতাংশ নদী ভাঙনজনিত কারণে রাজধানী শহরে ছুটে এসেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে স্থানান্তরিত দরিদ্র বস্তিবাসীর মধ্যে এক বড় অংশ আবার হিজলা, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ, চিলমারী, কুড়িগ্রাম প্রভৃতি নদী ভাঙন প্রকট এলাকা থেকে এসেছে। ঘূর্ণিঝড় কোমেন ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আঘাত হানে৷

 

বাতাসের গতি ছিল ৬৫ কিলোমিটার৷ কোমেনের প্রভাবে বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়েছিল৷ ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস এন্ড রেড ক্রিসেন্ট সোবাইটি (আইএফআরসিএস) এর দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান বব ম্যাকরো গত ২০১৫ সাল নদী ভাঙনকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রোয়ানু একটি ছোট ঘূর্নিঝড়, যা ২০১৬ সালে ২১ মে বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে এবং ভারতে আংশিক অঞ্চলে আঘাত হানে৷ ধারণা করা হয়, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ব্যাপ্তি ছিল দুটি বাংলাদেশের সমান আকৃতির৷ রোয়ানু-র আঘাতে চট্টগ্রামে ২৬ জনের মৃত্যু হয়৷ পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সূত্রমতে, মোট ৫৮টি জেলার ৭৭টি নদীতে ২১০টি থানার ৮৫টি শহর ও বন্দরসহ মোট ২৪৩টি স্থানে ভাঙন প্রবণতা রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, চাঁদপুর, টাঙ্গাইল, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, ফরিদপুর, বরিশাল, ভোলা, চট্টগ্রাম,
চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং জামালপুর জেলায় ভাঙনের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, গঙ্গা পদ্মা, মেঘনা, কুশিয়ারা, তিস্তা-খোয়াই, সুরমা, মনু, সাঙ্গু, গোমতী প্রভৃতি নদ-নদীতে ভাঙনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় মোরা ২০১৭ সালের ৩০ মে ১৪৬ কিলোমিটার বাতাসের গতিতে কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে৷ ঝড়ের তাণ্ডবে হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়৷ কক্সবাজারে বিদ্যুৎব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে৷

 

জমির ফসল এবং লবন চাষীদের জমাকৃত লবন নষ্ট হয়ে যায়৷ দুজন নারীসহ তিনজন মারা যায়৷ ২০১৯ সালের এপ্রিলে বঙ্গোপসাগর থেকে ভারতের উড়িষ্যা উপকূল হয়ে সর্বোচ্চ আড়াইশ কিলোমিটার গতিতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যায় শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণি। ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে বাংলাদেশে নয় জনের মৃত্যু হয়৷ তবে প্রাণহানি কম হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমান ছিল অনেক বেশি৷ সরকারি হিসাব মতে, ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে ঘরবাড়ি, বাঁধ, সড়ক ও কৃষিতে ৫৩৬ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়৷ বার বার দিক বদল করে ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর অতিপ্রবল এই ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগর দ্বীপ উপকূলে আঘাত হানার পর স্থলভাগ দিয়ে বাংলাদেশে আসায় ক্ষয়ক্ষতি আশঙ্কার চেয়ে কম হয়৷ ঝড়ে মারা যায় ২৪ জন৷

 

৭২ হাজার ২১২ টন ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার আর্থিক মূল্য ২৬৩ কোটি পাঁচ লাখ টাকা৷ ক্ষতি হয়েছে সুন্দরবনেরও৷ বিবিসি এর প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এই উত্তরাঞ্চলের সাতটি জেলা, উত্তর পূর্বাঞ্চলে সিলেট ও আশপাশের জেলা, পার্বত্য উপজেলাগুলো সহ মোট ১৫ টি জেলার বিস্তর এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম হতে জানা যায় বিভিন্ন
জেলায় বন্যায় ১১৪ জন মারা যায়। বন্যায় পানিবাহিত রোগের স্বাস্থ্য ঝুঁকির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণে ফসল নষ্ট হইয়েছে বলেও ধারণা করা হয়। বাংলাদেশ সিডিএ অথ্য অনুসারে, বন্যা সাধারণত মৌসুমী ঋতুতে হয়ে থাকে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর)। প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা (১৮%) বন্যায় প্লাবিত হয়। অতীতে বন্যা বাংলাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে বিশেষ করে ১৯৬৬, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৮ এবং ২০১৭ সালে।

 

অর্থ্যাৎ দেখা যায়, প্রতি ১০ বছর পর বাংলাদেশে একটি বড় বন্যা হয়ে থাকে। ২০ মে ২০২০ আম্পান ঘূর্ণিঝড় এর আংশীক আঘাত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আসে ও পশ্চিমবাংলা তার পুরুটাই আঘাত হানে। বন্যায় দেশের প্রায় ৩০টি জেলা কমবেশি প্লাবিত। মানুষ এখন আর শুধু ঘরবন্দি নয় পানি বন্দি হয়ে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছে। করোনা সংকটের মধ্যে এ বন্যা যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশ এমনিতেই এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে দেশে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।

 

উজান থেকে নেমে আসা পানির আধিক্য এবং অতিবৃষ্টিই বন্যার মূল কারণ। বন্যা শুধু মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তা কিন্তু নয়, গোটা দেশের অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করে ফেলে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও কৃষিনির্ভর। বন্যায় সেই কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে। গ্রামীণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে গ্রামে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাদের অধিকাংশই আবার দিন আনে দিন খায়। বন্যায় রাস্তাঘাট সবকিছু ডুবে যায় বলে তাদের রোজগারের পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। বন্যা কবলিত এলাকায় খাদ্যের অভাবে মানুষ মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়। বন্যার করালগ্রাসে মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষি জমি, বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বহু মানুষ ভূমিহীন হয়ে পড়ে।

 

এবারের বন্যার প্রভাবও তার ব্যতিক্রম নয়।  প্রতি বছরই নদী ভাঙনের পরিমাণ বেড়েছে। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, শরিয়তপুর কুষ্টিয়া, নড়াইল, পটুয়াখালী প্রভৃতি জেলায় গত বছর নদী ভাঙন প্রবল রূপে দেখা দেয়। এর মধ্যে কমপক্ষে ছয় দফা বন্যায় সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম জেলা, পাবনার বেড়া উপজেলা এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দি সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গেল বছর বান ও ভাঙনে কমপক্ষে পঁচিশ লাখ লোক কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে পত্র-পত্রিকা থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে।

 

নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, কুড়িগ্রামের নুনখাওয়া থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭৬ কিঃ মিঃ নদী পথের দু’তীরে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-পদ্মা ও মেঘনার ভাঙনে ৩০০ কিঃ মিঃ বাঁধ, ৪২টি সেতু কালভার্ট, স্লুইস গেটসহ শত শত গ্রাম নদীতে বিলীন হয়েছে। বিধ্বস্ত বাঁধগুলোর মধ্যে ৪০ কিঃ মিঃ বাঁধ সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়েছে।গত ৪৩ বছরে এ দেশেরস প্রায় দুই হাজার বর্গ কিঃ মিঃ এলাকা নদী ভাঙনে ক্ষয়ে গেছে। প্রতিবছর বাংলাদেশে সমুদ্রের পানির উচ্চতা আট মিলিমিটার করে বাড়ছে, যা বিশ্বের গড় বৃদ্ধির দ্বিগুণ৷ ২০৮০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলে পানির উচ্চতা ২ ফুট বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে৷

 

তাই যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশের ৪০ ভাগ এলাকা লবণ পানিতে তলিয়ে যাবে৷ এই ৪০ ভাগ এলাকায় প্রায় ৫ কোটি মানুষের বসবাস৷ এর ফলে ফসলি জমি নষ্ট হবে, কৃষক-জেলে তাঁদের পেশা হারাবেন৷ তাঁরা হারাবেন তাঁদের আশ্রয় বা আবাস৷ অবস্থার পেক্ষিতি মানুশ বাধ্য হচ্ছে স্থানান্তরিত হতে। ইউনেস্কোর ”জলবায়ুর পরিবর্তন ও বিশ্ব ঐতিহ্যের পাঠ” শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের ৭৫% ধ্বংস হয়ে যেতে পারে৷

 

আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে একই বছর ২ থেকে ৩ বার বড় ধরনের দুর্যোগ হানা দিচ্ছে৷ এমনকি, ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফ্ট-এর তালিকায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার আগে। ইউনিসেফ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ, যা দরিদ্র বাংলাদেশিদের তাদের ঘরবাড়ি ও কমিউনিটি ফেলে অন্যত্র নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

 

অনেকে ঢাকা ও অন্য বড় শহরগুলোতে যাচ্ছে, যেখানে শিশুদের বিপজ্জনক শ্রম বা শিশুবিয়ের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণার কথা উল্লেখ করে বলা যায়, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ৬০ লাখ জলবায়ুজনিত অভিবাসী রয়েছে, যে সংখ্যাটি ২০৫০ সালের
মধ্যে বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। বিশ্বব্যাপী বছরজুড়ে চলা প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। এর জন্য
ধনীদেশগুলোর শিল্পায়ন ও পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রমকে দায়ী করেছেন বিশ্লেষকরা। ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার-এর হিসাব অনুযায়ী,

 

জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত ছ’বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছেন৷ অন্যদিকে অভিবাসনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমও জানিয়েছে, ঢাকার বস্তি এলাকায় বসবাসকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে স্থানান্তরিত৷ বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকায় চলে আসেন অন্তত চার লক্ষ মানুষ ৷ দিনের হিসাব করলে প্রতিদিন কম করে হলেও দু’হাজার মানুষ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় আসেন আশ্রয়ের সন্ধানে৷ দরিদ্র আশ্রয়হীন এই মানুষগুলির ঠাঁই হয় বস্তিতে৷ এঁদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগই জলবায়ু উদ্বাস্তু৷

লেখক: কারিশমা আমজাদ
কলাম লেখক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও
পি এইচ ডি ফেলো, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Email: sristy70@gmail.com

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2021 bd-journalist.com
Theme Customized By newspadma.Com